সূচিপত্র: প্রাচীন যুগ
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে তিনটি প্রধান যুগে ভাগ করা হয়: প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ এবং আধুনিক যুগ। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগের সময়কাল ৬৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ । অন্যদিকে, ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে এর সময়কাল ৯৫০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ । বর্তমানে অধিকাংশ পণ্ডিত ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতকেই সমর্থন করেন। প্রাচীন যুগের একমাত্র সাহিত্যিক নিদর্শন হলো চর্যাপদ । এটি মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সাধন-সংগীতের সংকলন। ১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের "অন্ধকার যুগ" বলা হয়, কারণ এই সময়ে তুর্কি আক্রমণের কারণে উল্লেখযোগ্য কোনো সাহিত্যকর্ম পাওয়া যায় না। চর্যাপদ হলো বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন। এর আবিষ্কার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। প্রকাশনা: হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সম্পাদনায় ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে (বঙ্গীয় ১৩২৩) বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে চর্যাপদ ছাড়াও 'ডাকার্ণব' এবং 'দোহাকোষ' নামে আরও দুটি বই ছিল। নামকরণ: চর্যাপদের মূল নাম 'চর্যাচর্যবিনিশ্চয়'। ড. প্রবোধচন্দ্র বাগচী আবিষ্কৃত তিব্বতি অনুবাদ থেকে এর মূল নামটি জানা যায়। পদসংখ্যা: মোট সাড়ে ছেচল্লিশটি (৪৬.৫) পদ পাওয়া গেছে। ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে (অর্ধেক) পাওয়া গেছে। ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদ পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের পদকর্তাদের 'সিদ্ধাচার্য' বলা হয়। মোট ২৪ জন সিদ্ধাচার্যের পদ পাওয়া গেছে। তবে, তিব্বতি সূত্র অনুযায়ী চর্যার কবি সংখ্যা ৮৪ জন। চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট ও রহস্যময়। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর ভাষাকে 'আলো-আঁধারি ভাষা' বা 'সান্ধ্যভাষা' (Twilight Language) বলে অভিহিত করেছেন। এর কারণ হলো, পদগুলোর একটি বাহ্যিক বা সাধারণ অর্থ এবং একটি গভীর বা গূঢ় আধ্যাত্মিক অর্থ রয়েছে। ভাষাতাত্ত্বিক বিচারে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর "The Origin and Development of the Bengali Language" (১৯২৬) গ্রন্থে প্রমাণ করেন যে, চর্যাপদই বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন। এর ছন্দ মূলত মাত্রাবৃত্ত । চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের সাধন সংগীত। এর মূল দর্শন হলো তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের একটি বিশেষ শাখা, যা 'সহজযান' নামে পরিচিত। মূল তত্ত্ব: চর্যার কবিরা ছিলেন সহজ সাধনার অনুসারী। তারা প্রচলিত ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, শাস্ত্রীয় জ্ঞান ও দেব-দেবীর মূর্তিপূজার বিরোধী ছিলেন। দেহকেন্দ্রিক সাধনা: তাদের মতে, মানবদেহই হলো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিচ্ছবি এবং সকল সত্যের আধার। তাই দেহের বাইরে তীর্থযাত্রা বা শাস্ত্রপাঠের প্রয়োজন নেই। দেহের মধ্যেই পরম সত্য বা 'মহাসুখ' লাভ করা সম্ভব। গুরুবাদ: সহজিয়া সাধনায় গুরুর স্থান সর্বোচ্চ। গুরুর সাহায্য ছাড়া সাধনার গূঢ় রহস্য উন্মোচন করা বা নির্বাণ লাভ করা সম্ভব নয়। নির্বাণ বা মহাসুখ: তাদের সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো 'নির্বাণ' বা 'মহাসুখ' লাভ করা, যা হলো এক ধরনের পরম আনন্দময় ও শূন্য অবস্থা। প্রতীক ও রূপক: এই গভীর ও দুর্বোধ্য দর্শনকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য করার জন্য তারা দৈনন্দিন জীবন থেকে বিভিন্ন প্রতীক ও রূপক ব্যবহার করেছেন, যা চর্যাপদের ভাষাকে রহস্যময় করে তুলেছে। চর্যাপদ শুধু ধর্মীয় সাধন সংগীত নয়, এটি তৎকালীন (আনুমানিক দশম থেকে দ্বাদশ শতক) বাংলার সমাজ ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার একটি প্রামাণ্য দলিল। জীবনযাত্রা: তৎকালীন মানুষের জীবন ছিল দারিদ্র্যক্লিষ্ট। অনেক পদে ক্ষুধা ও অন্নাভাবের চিত্র ফুটে উঠেছে। যেমন: "টালত মোর ঘর নাহি পরবেষী, হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী।" (ঢেণ্ঢণপা)। পেশা: নৌকা চালানো, শিকার করা (শবরপা), তাঁত বোনা, মদ বিক্রি করা, তুলা ধোনা ইত্যাদি পেশার উল্লেখ পাওয়া যায়। সামাজিক শ্রেণি: ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল, ডোম, শবর ইত্যাদি বর্ণের মানুষের উল্লেখ আছে, যা তৎকালীন বর্ণপ্রথা ও সামাজিক বৈষম্যের ইঙ্গিত দেয়। খাদ্যাভ্যাস: ভাত, মাছ (বিশেষ করে রুই মাছ), হরিণের মাংস, দুধ ইত্যাদি খাওয়ার প্রচলন ছিল। সাংস্কৃতিক জীবন: নাচ, গান, বীণা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র এবং বিয়ের উৎসব (গায়ে হলুদ) ও যৌতুক প্রথার চিত্র পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা: চোর-ডাকাতের উপদ্রবের কথাও কিছু পদে উল্লেখ আছে। যেমন: "কানেট চোর নিল" (কাহ্নপা)। প্রকৃতির বর্ণনা (নদী, পাহাড়, চাঁদ) এবং মানব মনের অনুভূতির (আনন্দ, বেদনা) প্রকাশ এর সাহিত্যিক মান বৃদ্ধি করেছে। এখানে বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন যুগ ও চর্যাপদ বিষয়ে ভিত্তি করে বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার উপযোগী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর সংকলিত হলো। নিজের প্রস্তুতি যাচাই করার জন্য প্রশ্নগুলো অনুশীলন করুন।
এই পাতার জন্য MCQ বা পাঠ-সামগ্রী এখনও যোগ করা হয়নি। শীঘ্রই উপলব্ধ হবে।