বৈশ্বিক ইতিহাস ও ভূ-রাজনীতি
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বোঝার জন্য বৈশ্বিক ইতিহাস, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনীতির জ্ঞান অপরিহার্য। ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। এই কাঠামোর উপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যারা বিশ্বজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, ভূগোল কীভাবে রাষ্ট্রগুলোর শক্তি ও নীতিকে প্রভাবিত করে, তা ভূ-রাজনীতির মূল আলোচ্য বিষয়। বিসিএস পরীক্ষায় আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি অংশে এই তিনটি বিষয় থেকেই প্রশ্ন আসে। এই পৃষ্ঠায় আমরা একটি সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলোকে সহজ ও বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেছি। আধুনিক বিশ্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল ইউরোপের রেনেসাঁ, ধর্মসংস্কার, শিল্প বিপ্লব এবং বিভিন্ন যুগান্তকারী বিপ্লবের মাধ্যমে। রেনেসাঁ (Renaissance): চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতকে ইউরোপে শিল্প, সাহিত্য ও জ্ঞানে যে পুনর্জাগরণ ঘটে। এর মূল কেন্দ্র ছিল ইতালির ফ্লোরেন্স এবং মূল চেতনা ছিল মানবতাবাদ। উদাহরণ: লিওনার্দো দা ভিঞ্চির 'মোনালিসা', মাইকেলেঞ্জেলোর 'ডেভিড', শেক্সপিয়ারের নাটক। শিল্প বিপ্লব (Industrial Revolution): অষ্টাদশ শতকে যুক্তরাজ্যে বাষ্পীয় ইঞ্জিন, স্পিনিং জেনি ইত্যাদি আবিষ্কারের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যবস্থায় যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ফলাফল: পুঁজিবাদের বিকাশ, নগরায়ন, নতুন বুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণির উদ্ভব। ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯): 'সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা'র স্লোগান নিয়ে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে এই বিপ্লব সংঘটিত হয়। বাস্তিল দুর্গের পতনের (১৪ জুলাই) মাধ্যমে এর সূচনা। এটি বিশ্বে গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ধারণা ছড়িয়ে দেয়। রুশ বিপ্লব (১৯১৭): লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক পার্টির মাধ্যমে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের পতন এবং বিশ্বের প্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র 'সোভিয়েত ইউনিয়ন' প্রতিষ্ঠা। বিংশ শতাব্দী দুটি বিশ্বযুদ্ধ এবং প্রায় অর্ধশতাব্দী ব্যাপী স্নায়ুযুদ্ধের সাক্ষী, যা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার রূপ দিয়েছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮): পক্ষ: মিত্রশক্তি (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া) বনাম কেন্দ্রীয় শক্তি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য)। ফলাফল: ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির উপর কঠোর শর্ত আরোপ এবং বিশ্বশান্তির জন্য লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা। পক্ষ: মিত্রশক্তি (যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া) বনাম কেন্দ্রীয় শক্তি (জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, অটোমান সাম্রাজ্য)। ফলাফল: ভার্সাই চুক্তির মাধ্যমে জার্মানির উপর কঠোর শর্ত আরোপ এবং বিশ্বশান্তির জন্য লিগ অব নেশনস প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫): পক্ষ: মিত্রশক্তি (যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন) বনাম অক্ষশক্তি (জার্মানি, ইতালি, জাপান)। ফলাফল: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা (১৯৪৫), জার্মানির বিভক্তি, উপনিবেশবাদের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা। পক্ষ: মিত্রশক্তি (যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন) বনাম অক্ষশক্তি (জার্মানি, ইতালি, জাপান)। ফলাফল: জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা (১৯৪৫), জার্মানির বিভক্তি, উপনিবেশবাদের অবসান এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা। স্নায়ুযুদ্ধ (Cold War, ১৯৪৭-১৯৯১): সংজ্ঞা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন দুটি শিবিরের মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ছাড়াই যে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলে। সামরিক জোট: ন্যাটো (NATO, ১৯৪৯) এবং ওয়ারশ প্যাক্ট (Warsaw Pact, ১৯৫৫)। গুরুত্বপূর্ণ সংকট: কোরীয় যুদ্ধ, কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট (১৯৬২), ভিয়েতনাম যুদ্ধ। অবসান: বার্লিন প্রাচীরের পতন (১৯৮৯) এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের (১৯৯১) মাধ্যমে এর অবসান ঘটে। সংজ্ঞা: যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন দুটি শিবিরের মধ্যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ ছাড়াই যে ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব চলে। গুরুত্বপূর্ণ সংকট: কোরীয় যুদ্ধ, কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকট (১৯৬২), ভিয়েতনাম যুদ্ধ। অবসান: বার্লিন প্রাচীরের পতন (১৯৮৯) এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের (১৯৯১) মাধ্যমে এর অবসান ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জাতিসংঘ (United Nations) প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি বিশ্বের প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা। প্রধান অঙ্গসংস্থা (৬টি): সাধারণ পরিষদ (General Assembly): সকল সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত, একে 'বিশ্বের বিতর্ক সভা' বলা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council): আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। এর সদস্য ১৫টি, যার মধ্যে ৫টি স্থায়ী (P5: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন) এবং এদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC): অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়ে কাজ করে। আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালত (ICJ): এর সদর দপ্তর নেদারল্যান্ডসের হেগ-এ অবস্থিত। সচিবালয় (Secretariat): জাতিসংঘের প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করে। এর প্রধান হলেন মহাসচিব। অছি পরিষদ (Trusteeship Council): এর কার্যক্রম বর্তমানে স্থগিত রয়েছে। সাধারণ পরিষদ (General Assembly): সকল সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে গঠিত, একে 'বিশ্বের বিতর্ক সভা' বলা হয়। নিরাপত্তা পরিষদ (Security Council): আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত। এর সদস্য ১৫টি, যার মধ্যে ৫টি স্থায়ী (P5: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন) এবং এদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ECOSOC): অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বিষয়ে কাজ করে। সচিবালয় (Secretariat): জাতিসংঘের প্রশাসনিক কার্য পরিচালনা করে। এর প্রধান হলেন মহাসচিব। বিশেষায়িত সংস্থা (উদাহরণ): UNESCO (প্যারিস), WHO (জেনেভা), FAO (রোম), ILO (জেনেভা), IMF ও World Bank (ওয়াশিংটন ডি.সি.)। জাতিসংঘ ছাড়াও বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক জোট বিশ্বজুড়ে সহযোগিতা ও সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান: বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO): আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়মকানুন নির্ধারণ করে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ (World Bank Group): উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ঋণ ও সহায়তা দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF): সদস্য দেশগুলোর মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় কাজ করে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ (World Bank Group): উন্নয়নশীল দেশগুলোকে উন্নয়নমূলক কাজের জন্য ঋণ ও সহায়তা দেয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF): সদস্য দেশগুলোর মুদ্রা বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখতে এবং অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় কাজ করে। আঞ্চলিক জোট (উদাহরণ): ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU): ইউরোপের দেশগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জোট। আসিয়ান (ASEAN): দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট। সার্ক (SAARC): দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জোট। বিমসটেক (BIMSTEC): বঙ্গোপসাগর অঞ্চলের দেশগুলোর কারিগরি ও অর্থনৈতিক জোট। ন্যাটো (NATO): উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর সামরিক জোট। ভূগোল কীভাবে রাষ্ট্রের নীতি ও শক্তিকে প্রভাবিত করে, তা নিয়ে ভূ-রাজনীতি আলোচনা করে। হার্টল্যান্ড তত্ত্ব (ম্যাকিন্ডার): যে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ার বিশাল ভূখণ্ড (হার্টল্যান্ড) নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বিশ্ব শাসন করবে। রিমল্যান্ড তত্ত্ব (স্পাইকম্যান): হার্টল্যান্ডের উপকূলীয় অঞ্চল (রিমল্যান্ড) নিয়ন্ত্রণ করাই বিশ্ব শাসনের চাবিকাঠি। সমুদ্রশক্তি তত্ত্ব (মাহান): শক্তিশালী নৌ-বাহিনী ও সমুদ্রের উপর নিয়ন্ত্রণই জাতীয় শক্তির মূল। মৌলিক ধারণা: বাফার রাষ্ট্র: দুটি বৃহৎ শক্তির মাঝে অবস্থিত অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্র (যেমন: নেপাল)। চোকপয়েন্ট: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ (যেমন: হরমুজ প্রণালী, মালাক্কা প্রণালী)। প্রভাব বলয় (Sphere of Influence): একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের দ্বারা অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব। বাফার রাষ্ট্র: দুটি বৃহৎ শক্তির মাঝে অবস্থিত অপেক্ষাকৃত দুর্বল রাষ্ট্র (যেমন: নেপাল)। চোকপয়েন্ট: কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ (যেমন: হরমুজ প্রণালী, মালাক্কা প্রণালী)। প্রভাব বলয় (Sphere of Influence): একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের দ্বারা অন্য রাষ্ট্রের উপর প্রভাব। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্দিষ্ট ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিদ্যমান। দক্ষিণ এশিয়া: ভারত-পাকিস্তান কাশ্মীর বিরোধ; আফগানিস্তান সংকট; ভারত মহাসাগরে চীনের 'স্ট্রিং অব পার্লস' কৌশলের বিপরীতে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল। মধ্যপ্রাচ্য: সৌদি আরব-ইরান প্রতিদ্বন্দ্বিতা (শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব ও প্রক্সি যুদ্ধ); ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংকট। পূর্ব এশিয়া: দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে চীনের সাথে ফিলিপাইন, ভিয়েতনামসহ অন্যান্য দেশের বিরোধ; তাইওয়ান প্রণালী সংকট। ইউরোপ: রাশিয়ার প্রভাব বিস্তার এবং ন্যাটোর সম্প্রসারণকে কেন্দ্র করে ইউক্রেন যুদ্ধ। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া এবং বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। অবস্থান: দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এবং বঙ্গোপসাগরের শীর্ষে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান। ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি: বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীনের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল: যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ার সম্ভাবনা। বঙ্গোপসাগর: এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের জন্য বঙ্গোপসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে মায়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিজয়ের পর বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
এই পাতার জন্য MCQ বা পাঠ-সামগ্রী এখনও যোগ করা হয়নি। শীঘ্রই উপলব্ধ হবে।