বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা একটি বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র। এই ব্যবস্থার প্রাণ হলো রাজনৈতিক দল, যারা জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য শুধু সরকারি দলই নয়, বরং বিরোধী দল, সুশীল সমাজ এবং বিভিন্ন চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পক্ষগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, কার্যক্রম এবং প্রভাবের মাধ্যমেই দেশের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি নির্ধারিত হয়। বিসিএস পরীক্ষার জন্য এই গতিশীল সম্পর্ক এবং প্রতিটি পক্ষের ভূমিকা সম্পর্কে গভীর ধারণা থাকা অপরিহার্য। এই পৃষ্ঠায় আমরা এই বিষয়গুলো বিস্তারিত ও উদাহরণসহ আলোচনা করেছি। রাজনৈতিক দল হলো এমন একদল সংগঠিত মানুষ, যারা নির্দিষ্ট কর্মসূচি ও নীতির ভিত্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করে। সাংবিধানিক ভিত্তি: সংবিধানের ৩৮ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রত্যেক নাগরিকের সমিতি বা সংঘ গঠন করার স্বাধীনতা রয়েছে। নিবন্ধন: নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য প্রত্যেক রাজনৈতিক দলকে 'গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২' (RPO) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে (EC) নিবন্ধন করতে হয়। নিবন্ধনের জন্য দলের একটি কেন্দ্রীয় কমিটি, অন্তত এক-তৃতীয়াংশ প্রশাসনিক জেলায় কার্যকর দপ্তর এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য থাকতে হয়। সাংগঠনিক কাঠামো (উদাহরণ): প্রায় সকল দলের একটি স্তরভিত্তিক কাঠামো থাকে, যেমন: জাতীয় কাউন্সিল/কংগ্রেস (সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী ফোরাম) → কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি → জেলা/মহানগর কমিটি → উপজেলা/থানা কমিটি → ইউনিয়ন/ওয়ার্ড কমিটি। জনমত গঠন: সভা, সমাবেশ, মিছিল, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণার মাধ্যমে নিজেদের নীতির পক্ষে জনমত গঠন করা। স্বার্থ একত্রীকরণ: সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের (যেমন: কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, ছাত্র) দাবি-দাওয়া ও স্বার্থকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত নির্বাচনী ইশতেহারে রূপ দেওয়া। সরকার গঠন ও পরিচালনা: নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী দল সরকার গঠন করে এবং তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। বিকল্প সরকার: বিরোধী দল সংসদে ও সংসদের বাইরে সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে এবং নিজেদেরকে একটি বিকল্প সরকার হিসেবে উপস্থাপন করে। রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ: জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন করা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। সংসদ-বহির্ভূত কার্যক্রম: সরকারের নীতির বিরুদ্ধে হরতাল, অবরোধ, বিক্ষোভ प्रदर्शन, মানববন্ধন ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (প্রতিষ্ঠা: ১৯৪৯): বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দল। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল - বিএনপি (প্রতিষ্ঠা: ১৯৭৮): দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। অন্যান্য: বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইত্যাদি। একটি সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যকারিতা বহুলাংশে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সম্পর্কের উপর নির্ভর করে। ক্ষমতাসীন দল: সরকার পরিচালনা, আইন প্রণয়নে নেতৃত্ব দেওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ করা এর প্রধান দায়িত্ব। প্রধানমন্ত্রী 'সংসদ নেতা' হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিরোধী দল: সরকারের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এর প্রধান দায়িত্ব। বিরোধী দলের নেতা 'বিরোধীদলীয় নেতা' হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি পান। বিরোধী দলকে 'ছায়া সরকার' (Shadow Government) বলা হয়। বৈরী সম্পর্ক (Adversarial Politics): ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সহযোগিতার চেয়ে সংঘাতের সম্পর্কই বেশি পরিলক্ষিত হয়। একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতার অভাব একটি প্রধান সমস্যা। সংসদ বর্জন (Parliament Boycott): বিরোধী দলগুলোর একটি সাধারণ চর্চা হলো সংসদ অধিবেশন বর্জন করা, যা সংসদের কার্যকারিতা হ্রাস করে। সংসদ-বহির্ভূত রাজনীতি: জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংসদে আলোচনার পরিবর্তে রাজপথে হরতাল, অবরোধ ও বিক্ষোভের মাধ্যমে সমাধানের প্রবণতা বেশি। ঐকমত্যের অভাব: জাতীয় স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়গুলোতেও (যেমন: নির্বাচন ব্যবস্থা, পররাষ্ট্র নীতি) প্রধান দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের অভাব দেখা যায়। জাতীয় সংসদ: রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপর আলোচনা, বাজেট আলোচনা, প্রশ্নোত্তর পর্ব, এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিশ প্রদানের মাধ্যমে বিরোধী দল সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। সংসদীয় স্থায়ী কমিটি: মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনার জন্য গঠিত কমিটিগুলোতে বিরোধী দলের সদস্যরাও থাকেন। 'সরকারি হিসাব কমিটি' (PAC)-র চেয়ারম্যান প্রথা অনুযায়ী বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হন। সুশীল সমাজ বা সিভিল সোসাইটি হলো রাষ্ট্র ও বাজারের বাইরে অলাভজনক ও বেসরকারি সংগঠনসমূহের সমষ্টি, যারা জনস্বার্থে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান: সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD): অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণ করে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS): উন্নয়ন বিষয়ে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন): নির্বাচন পর্যবেক্ষণ ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD): অর্থনীতি ও উন্নয়ন বিষয়ে গবেষণা ও নীতি বিশ্লেষণ করে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (BIDS): উন্নয়ন বিষয়ে সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মানবাধিকার ও আইন সহায়তা সংস্থা: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক): মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনি সহায়তা নিয়ে কাজ করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB): দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB): দুর্নীতিবিরোধী গবেষণা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (NGO): ব্র্যাক: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও। আশা, প্রশিকা, টিএমএসএস ইত্যাদি। ব্র্যাক: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের বৃহত্তম এনজিও। ওয়াচডগ (Watchdog) বা তত্ত্বাবধায়ক: সরকারের কার্যক্রম, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং দুর্নীতির উপর নজরদারি করা। অ্যাডভোকেসি ও জনমত গঠন: নির্দিষ্ট বিষয়ে (যেমন: পরিবেশ রক্ষা, নারী অধিকার) জনসচেতনতা তৈরি এবং সরকারের নীতি পরিবর্তনে চাপ সৃষ্টি করা। সেবা প্রদান: শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্ষুদ্রঋণের মতো মৌলিক সেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া। চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী হলো এমন সব সংগঠন, যারা সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে নিজ নিজ গোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সরকারের নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। ব্যবসায়ী সংগঠন: এফবিসিসিআই (FBCCI): ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন। বিজিএমইএ (BGMEA) ও বিকেএমইএ (BKMEA): তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন। ভূমিকা: বাজেট প্রণয়নের সময় কর হ্রাস, রপ্তানিতে প্রণোদনা, এবং ব্যবসা-বান্ধব নীতি গ্রহণের জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে। ভূমিকা: বাজেট প্রণয়নের সময় কর হ্রাস, রপ্তানিতে প্রণোদনা, এবং ব্যবসা-বান্ধব নীতি গ্রহণের জন্য সরকারের উপর চাপ প্রয়োগ করে। পেশাজীবী সংগঠন: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (BMA): ডাক্তারদের সংগঠন। ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (IEB): প্রকৌশলীদের সংগঠন। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি। ভূমিকা: নিজ নিজ পেশার সদস্যদের বেতন, পদমর্যাদা, এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে। ভূমিকা: নিজ নিজ পেশার সদস্যদের বেতন, পদমর্যাদা, এবং পেশাগত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে। শ্রমিক সংগঠন (Trade Union): উদাহরণ: বিভিন্ন গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশন, পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন। ভূমিকা: শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অন্যান্য অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন ও দর কষাকষি করে। ভূমিকা: শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং অন্যান্য অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন ও দর কষাকষি করে। কৃষক সংগঠন: বিভিন্ন কৃষক সমিতি। ভূমিকা: সারের ভর্তুকি, ফসলের ন্যায্যমূল্য এবং কৃষিঋণের জন্য দাবি জানায়। লবিং (সরাসরি আলোচনা), গণমাধ্যমে বিবৃতি প্রদান, গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন, স্মারকলিপি পেশ, এবং কখনও কখনও ধর্মঘট বা কর্মবিরতির মতো কর্মসূচি পালন করে। এখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের সম্পর্ক, সুশীল সমাজ এবং চাপ সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ভূমিকার উপর ভিত্তি করে বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার উপযোগী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর সংকলিত হলো। নিজের প্রস্তুতি যাচাই করার জন্য প্রশ্নগুলো অনুশীলন করুন।
এই পাতার জন্য MCQ বা পাঠ-সামগ্রী এখনও যোগ করা হয়নি। শীঘ্রই উপলব্ধ হবে।