সূচিপত্র: বানান ও বাক্য শুদ্ধি
বাংলা ব্যাকরণে বানান ও বাক্য শুদ্ধি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিসিএসসহ যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই অংশ থেকে প্রশ্ন আসে। ভাষার সঠিক ও প্রমিত রূপ ব্যবহারের জন্য বানান এবং বাক্যের গঠন নির্ভুল হওয়া আবশ্যক। বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম এই ক্ষেত্রে প্রধান অনুসরণীয়। এই পৃষ্ঠায় আমরা বানান ও বাক্য শুদ্ধির বিভিন্ন নিয়ম এবং প্রচুর উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করব। বাম পাশের সূচি থেকে নির্দিষ্ট বিষয় দেখতে ক্লিক করুন। ঋ, র, ষ—এই তিনটি বর্ণের পরে মূর্ধন্য 'ণ' হয়। যেমন: ঋণ, তৃণ, বর্ণ, বিষ্ণু, বরিষণ, ভূষণ, ভীষণ, উষ্ণ, বর্ণনা, কারণ, মরণ, হরণ, পূরণ, পাষাণ, ভাষণ, ব্যাকরণ, ব্রহ্মাণ্ড, ভণিতা। ঋ, র, ষ-এর পরে স্বরবর্ণ, ক-বর্গ (ক, খ, গ, ঘ, ঙ), প-বর্গ (প, ফ, ব, ভ, ম), য, ব, হ, ং থাকলে তার পরবর্তী 'ন' মূর্ধন্য 'ণ' হয়। যেমন: কৃপণ, হরিণ, অর্পণ, লক্ষণ, রামায়ণ, গ্রহণ, পরিবহণ, ব্রাহ্মণ, অগ্রহায়ণ, নারায়ণ, পরায়ণ, সর্বাঙ্গীণ, দ্রাঘিমা। ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ) আগে যুক্ত 'ন' সর্বদা 'ণ' হয়। যেমন: ঘণ্টা, লুণ্ঠন, কাণ্ড, বণ্টন, দণ্ড, কুণ্ড, খণ্ড, পাষণ্ড, কণ্টক। প্র, পরা, পরি, নির—এই উপসর্গগুলোর পরে 'ণ' হয়। যেমন: প্রণাম, পরায়ণ, পরিণয়, নির্ণয়, প্রণীত, প্রমাণ, প্রণয়ন, প্রবীণ, পরিণাম, প্রাঙ্গণ। তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি শব্দের বানানে 'ণ' হয় না, 'ন' হয়। যেমন: ইরান, কোরান, জার্মান, গভর্নর, কর্নার, সোনা, কান, ড্রেন, ট্রেন, ফার্নিচার, কেরানি, পুরনো, ধরন, রানার, কোরআন। সমাসবদ্ধ পদে সাধারণত ণ-ত্ব বিধান খাটে না। যেমন: ত্রিনয়ন, সর্বনাম, দুর্নীতি, দুর্নাম, পরনিন্দা, অগ্রনায়ক, ত্রিনেত্র, কর্মনিষ্ঠ, সমাসীন। ত-বর্গীয় ধ্বনির (ত, থ, দ, ধ) সঙ্গে যুক্ত 'ন' কখনো 'ণ' হয় না। যেমন: অন্ত, গ্রন্থ, ক্রন্দন, বৃন্ত, দন্ত, বন্ধন, সন্ধান, চন্দন, নিরন্তর। ঋ এবং ঋ-কারের পরে 'ষ' হয়। যেমন: ঋষি, কৃষক, তৃষ্ণা, উৎকৃষ্ট, বৃষ্টি, সৃষ্টি, বৃষ, কৃষ্টি, ভ্রষ্ট, ষষ্ঠ, বিকশিত। অ, আ ভিন্ন অন্য স্বরবর্ণ (ই, উ, এ, ঐ, ও, ঔ) এবং ক, র-এর পরে 'ষ' হয়। যেমন: ভবিষ্যৎ, মুমূর্ষু, চক্ষুষ্মান, পরিষ্কার, দুষ্কর, আবিষ্কার, নিষ্প্রয়োজন, বহিষ্কার, চতুষ্পদ, নিষ্পাপ, দুষ্প্রাপ্য, আয়ুষ্মান, মস্তিষ্ক, ঔষধ, সুষমা। ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ) সঙ্গে যুক্ত হলে 'ষ' হয়। যেমন: কষ্ট, নষ্ট, ষষ্ঠ, কাষ্ঠ, ওষ্ঠ, অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান, পৃষ্ঠা, বিশিষ্ট, মিষ্ট, শ্রেষ্ঠ, অনিষ্ট। অতি, অভি, অনু, সু, পরি—ইত্যাদি ই-কারান্ত বা উ-কারান্ত উপসর্গের পর কিছু ধাতুর 'স' পরিবর্তিত হয়ে 'ষ' হয়। যেমন: অভিষেক, অনুষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান, প্রতিষেধক, বিষম, সুষুপ্ত, অনুষঙ্গ, প্রতিস্থান, বিষাদ, নিষাদ, অধিষ্ঠান, অনুসৃত। অ, আ স্বরধ্বনির পর 'স' হয়। যেমন: পুরস্কার, নমস্কার, তিরস্কার, ভাস্কর, মনস্কামনা, পুরস্কৃত, পরস্পর, বয়স্ক, বাচস্পতি, শ্রেয়স্কর। বিদেশি শব্দে 'ষ' হয় না। যেমন: পোস্ট, স্টেশন, বাস, জিনিস, পোশাক, মাস্টার, ইসলাম, মুসলমান, গ্রিস, আইসক্রিম, স্টার, ডিজাইন, পোস্টার। বাংলা বানানের অন্যতম বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো ই-কার ও ঈ-কারের ব্যবহার। বাংলা একাডেমির নিয়ম অনুযায়ী এর ব্যবহার অনেকটাই সহজ করা হয়েছে। সকল অতৎসম (তদ্ভব, দেশি, বিদেশি, মিশ্র) শব্দে কেবল হ্রস্ব ই-কার (ি) ব্যবহৃত হবে। যেমন: পাখি, বাড়ি, শাড়ি, গাড়ি, দিঘি, কুমির, মিস্ত্রি, রুপালি, সরকারি, জানুয়ারি, ডিগ্রি, উকিল, আমির, গরিব, আসামি, শ্রেণি, পদবি, পল্লি, হিজরি। ভাষা ও জাতিবাচক শব্দের শেষে ই-কার হবে। যেমন: বাঙালি, জাপানি, ইংরেজি, ইরানি, হিন্দি, আরবি, ফারসি, তুর্কি, জার্মানি, ইতালি, ফরাসি। '-আলি' প্রত্যয়যুক্ত শব্দে ই-কার হবে। যেমন: সোনালি, রুপালি, বর্ণালি, মিতালি, খেয়ালি, হেঁয়ালি, পুবালি। '-অঞ্জলি' দ্বারা গঠিত শব্দে ই-কার হবে। যেমন: গীতাঞ্জলি, শ্রদ্ধাঞ্জলি, পুষ্পাঞ্জলি। '-জীবী' (পেশা অর্থে) বানানে উভয়ই দীর্ঘ ঈ-কার (ী) হবে। যেমন: চাকরিজীবী, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, শ্রমজীবী, মৎস্যজীবী, কৃষিজীবী, পরজীবী। '-বলি' (সমূহ অর্থে) হলে হ্রস্ব ই-কার, কিন্তু '-বলী' (শক্তিশালী অর্থে) হলে দীর্ঘ ঈ-কার হবে। যেমন: কার্যাবলি, শর্তাবলি, তথ্যাবলি, ব্যাখ্যাবলি; কিন্তু শক্তিশালী, রূপবতী, বলবান। পদের শেষে '-বিহীন', '-কালীন', '-হীন', '-কালীন' ইত্যাদি থাকলে দীর্ঘ ঈ-কার হবে। যেমন: অন্তহীন, সমকালীন, তৎকালীন, সীমাহীন, সঙ্গীবিহীন, অর্থহীন, নবীন, অধীন, সমীচীন। স্ত্রীবাচক তৎসম শব্দে ঈ-কার হয়। যেমন: জননী, নারী, দেবী, সতী, মহীয়সী, গরীয়সী, যুবতী, তরুণী, সুন্দরী, বিদুষী, লক্ষ্মী, রমণী, কল্যাণীয়া। বিদেশি শব্দে এবং বাংলা তদ্ভব শব্দে হ্রস্ব উ-কার (ু) ব্যবহৃত হয়। যেমন: কুপন, পুডিং, স্কুল, ইউনিভার্সিটি, সুর, রুপা, রুপি, উট, উনুন, মুলা, শুধু, তবু, পশু। '-ভূত' (হওয়া অর্থে) হলে দীর্ঘ ঊ-কার (ূ) হয়। যেমন: একীভূত, বহির্ভূত, অন্তর্ভুক্ত, দূরীভূত, ঘনীভূত, দ্রবীভূত। কিন্তু 'অদ্ভুত' বানানে হ্রস্ব উ-কার। 'দূর' শব্দটি দূরত্ব বোঝালে দীর্ঘ ঊ-কার হয় (দূর, দূরবর্তী, দূরবীক্ষণ, দূরত্ব)। কিন্তু উপসর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হলে হ্রস্ব উ-কার হয়, যেমন: দুরবস্থা, দুর্ঘটনা, দুর্যোগ, দুর্নীতি, দুরূহ। মূর্ধন্য 'ণ' ও 'ষ'-এর মতো ঊ-কারও মূলত তৎসম শব্দের বৈশিষ্ট্য। যেমন: মুহূর্ত, মুমূর্ষু, দূষণ, ভূষণ, রূপ, ভূত, শূন্য, পূজা, গূঢ়, সূচি, ভূমি, ঊষা, ঊন। ইংরেজি 's' ধ্বনির জন্য 'স' এবং 'sh', '-sion', '-tion' ইত্যাদির জন্য 'শ' ব্যবহৃত হয়। যেমন: বাস, গ্লাস, ক্লাস, পাস, অফিস, হসপিটাল; স্টেশন, মিশন, টেলিভিশন, রেশন, শার্ট, কমিশন, সেশন। আরবি-ফারসি শব্দে 'স', 'সিন' ও 'সোয়াদ'-এর জন্য 'স' এবং 'শিন'-এর জন্য 'শ' ব্যবহৃত হয়। যেমন: সালাম, হিসাব, ইসলাম, মুসলমান, আসল; শরবত, শরম, শহর, শরিক, নালিশ। বিদেশি শব্দে 'ণ' এবং 'ষ' ব্যবহৃত হয় না। যেমন: কর্নার, হর্ন, পোশাক, জিনিস, স্টার, স্টোর, মাস্টার, পোস্ট, ফটোস্ট্যাট, ইঞ্জিনিয়ার, ডিজাইন। ইংরেজি 'st' যুক্তবর্ণের জন্য 'স্ট' হয়। যেমন: স্টেশন, পোস্ট, স্টোর, মাস্টার, বাসস্ট্যান্ড, স্টুডিও, আগস্ট, খ্রিস্ট, খ্রিস্টাব্দ। কিছু প্রচলিত শব্দ রয়েছে যেগুলোর বানান প্রায়ই ভুল হয়। এখানে একটি তালিকা দেওয়া হলো। বানান ছাড়াও বাক্যে নানা ধরনের ভুল হতে পারে, যেমন— বাহুল্য দোষ, গুরুচণ্ডালী দোষ, পদের ভুল প্রয়োগ ইত্যাদি। এখানে কিছু উদাহরণ দেওয়া হলো। এখানে বাংলা বানান ও বাক্য শুদ্ধির বিভিন্ন নিয়ম, যেমন—ণ-ত্ব ও ষ-ত্ব বিধান, বাহুল্য দোষ, গুরুচণ্ডালী দোষ এবং অন্যান্য সাধারণ ভুলের উপর ভিত্তি করে বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার উপযোগী গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর সংকলিত হলো। নিজের প্রস্তুতি যাচাই করার জন্য প্রশ্নগুলো অনুশীলন করুন।
এই পাতার জন্য MCQ বা পাঠ-সামগ্রী এখনও যোগ করা হয়নি। শীঘ্রই উপলব্ধ হবে।